প্লট-জমি নিয়ে জটিলতায় প্রায় ১২০ পরিবার

সরকারি খাসজমি দখল করে রাস্তা, মসজিদ ও আবাসিক প্রকল্পের অবকাঠামো গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে উত্তরণ হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে। শুধু অভিযোগ নয়, সরকারের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনেও প্রকল্পটির আওতায় বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া প্রকল্প পরিচালনা এবং কালেক্টরের অনুমোদন ছাড়াই জমি নামজারির কার্যক্রম চালানোর বিষয়টিও চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।
তদন্তের পর সরকারি জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। সরকারি জমি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত উত্তরণ হাউজিংয়ের নামজারি কার্যক্রম স্থগিত রাখার পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পটিকে ঘিরে জমি ও টাকা নিয়ে জটিলতায় পড়েছে প্রায় ১২০টি পরিবার—এমন দাবি ভুক্তভোগীদের।
যেভাবে শুরু, যেভাবে ‘উত্তরণ’
জানা গেছে, ২০০৭ সালের দিকে ‘মিশন এনার্জি অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেন মো. আব্দুল খায়ের ও জসীম উদ্দিন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুল খায়ের। পরে নাজিম উদ্দিন সরকারকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর বিভিন্ন এলাকায় জমি প্রকল্পভুক্ত ও দখলের তৎপরতায় নাজিমের প্রভাব ব্যবহার করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সময় তাঁদের সঙ্গে নাজিমের ছবিও দেখা গেছে।
২০১৩ সালে মিশনের কার্যক্রম ও সম্পদ বিলুপ্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ‘উত্তরণ হাউজিং’ নামে কার্যক্রম শুরু করেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের পর তদন্ত, বেরিয়ে এলো সরকারি জমির হিসাব
ধউর ও আশুতিয়া এলাকায় উত্তরণ হাউজিং সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখল করেছে—এমন অভিযোগের তদন্তে নেমে প্রশাসন একাধিক নথি তৈরি করে। সেসব সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকল্পটির আওতায় থাকা সরকারি জমির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ধউর ও আশুতিয়া মৌজার কয়েক শ বাসিন্দার পক্ষে মো. মানিক চৌধুরী ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বালু ভরাট করে সাধারণ মানুষের পৈতৃক সম্পত্তি ও সরকারি খাসজমি দখল করছে উত্তরণ হাউজিং। প্রতিষ্ঠানটি প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছে না।
অভিযোগ পাওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায়, ৫ ফেব্রুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি-১ অধিশাখার উপসচিব মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ ঢাকা জেলা প্রশাসককে বিষয়টি সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিলের পরিপত্র অনুযায়ী কোনো হাউজিং প্রকল্পে সরকারি জমি থাকলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া যায় না।
এরপর ৪ মার্চ ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৩০ মার্চ তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ কে এম হাসানুর রহমান ধউর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রকল্পের ভেতরে কতটুকু সরকারি জমি রয়েছে এবং তা জোর করে দখল করা হয়েছে কি না, রেকর্ডপত্র যাচাই করে সুস্পষ্ট মতামত দিতে বলা হয়।
১২ মে ধউর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মিনারুল হক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
একাধিক মৌজায় সরকারি জমি প্রকল্পের দখলে
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, ধউর মৌজার সিটি জরিপের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ১০০৫ নম্বর দাগের ০.৩৯০০ একর বা সাড়ে ২৩ কাঠা সরকারি জমিতে ২০ ফুট চওড়া রাস্তা ও ৫ হাজার ৫২৯ বর্গফুটের একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
শুধু এই জমিই নয়, ভূমি সংস্কার বোর্ড, কোর্ট অব ওয়ার্ডস ও ভাওয়াল রাজ এস্টেটের মালিকানাধীন—
১০১১, ১০১৭, ১০১৮, ১০৩০, ১০৩৭, ১২০১, ১২০২, ১২০৩, ১২০৪, ১২০৬, ১২০৭, ১২০৮ ও ১২১১ নম্বর দাগের জমিও প্রকল্পটির দখলে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
আশুতিয়া মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৩০৭, ৩২৫, ৩২৬, ৩২৮, ৩৩০, ৩৩১, ৩৩৬, ৩৩৮ ও ৩৪৫ নম্বর দাগের জমিও প্রতিষ্ঠানটির দখলে রয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।
অন্যদিকে ভাটুলিয়া মৌজার ১১৯, ৯২১, ৯২৩ ও ৯২৬ নম্বর দাগের জমি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখার তথ্যও রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
অর্থাৎ, অভিযোগের পর মাঠপর্যায়ের তদন্তে একাধিক মৌজা ও একাধিক দাগে সরকারি জমি প্রকল্পটির দখলে থাকার তথ্য নথিবদ্ধ হয়েছে।
দুই বড় অনিয়ম চিহ্নিত প্রশাসনের
মাঠপর্যায়ের তদন্তের পর ২০ মে মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বায়েজীদ সরদার ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে সারসংক্ষেপ পাঠান।
এরপর ৩০ জুন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান।
সেই প্রতিবেদনে দুটি বড় অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়।
প্রথমত, ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিলের পরিপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেয়নি উত্তরণ হাউজিং।
দ্বিতীয়ত, ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ৫২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসরণ না করে কালেক্টরের অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির নামে জমি নামজারির কার্যক্রম চালানোর বিষয়টি উঠে আসে প্রতিবেদনে।
নামজারি স্থগিত, সরকারি জমি উদ্ধারের নির্দেশ
তদন্তের পর সরকারি জমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নিতে ১৩ জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি-১ অধিশাখা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে সই করেন যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম।
এর ধারাবাহিকতায় ৬ আগস্ট ঢাকা জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব সার্কেলকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলে।
নির্দেশনায় বলা হয়, উত্তরণ হাউজিংয়ের অবৈধ দখলে থাকা সরকারি জমি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের নামজারি কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
ভূমি সিলিংয়ের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত অন্য কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দখলে থাকা সরকারি জমিতে ‘সরকারি সম্পত্তি’ উল্লেখ করে নোটিশ বোর্ড বসানোর পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩’-এর ৭(৩) ধারায় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ধউর এলাকায় গিয়ে সরকারি জমিতে এমন নোটিশ বোর্ডও দেখা গেছে। তবে একই প্রকল্পে বিভিন্ন প্লটের সীমানা তৈরিসহ কিছু কাজ চলতে দেখা যায়।
মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বায়েজীদ সরদার বলেন, ‘উত্তরণের প্রজেক্টের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। কিছু জায়গায় সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন ডিজিটাল সার্ভে করা হচ্ছে। এরপর যেসব এলাকায় সরকারি জমি রয়েছে, সব জায়গায় সাইনবোর্ড লাগানো হবে। এটি শেষ হলে আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব।’
ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমও সরকারি জমি উদ্ধারে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, উদ্ধার করা সরকারি জমি আবার বেদখল হতে দেওয়া হবে না। উচ্ছেদের পর কোনো জমি আবার দখল হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, একটি জমি উদ্ধার করতে সরকারের বিপুল অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু তদারকির অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তা আবার বেদখল হয়ে যায়। এটি বড় ধরনের ‘সিস্টেম লস’।
মসজিদের আড়ালে খাসজমি?
সরকারি জমি দখলের সবচেয়ে আলোচিত নমুনা দেখা গেছে ধউর মৌজায়। সেখানে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি মসজিদ ও ২০ ফুট চওড়া রাস্তা।
গণমাধ্যমের হাতে থাকা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০০৫ নম্বর দাগের ০.৩৯০০ একর সরকারি জমির ওপর ৫ হাজার ৫২৯ বর্গফুটের মসজিদ ও রাস্তা তৈরি করেছে উত্তরণ হাউজিং।
সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের প্রবেশপথে কাঠের দানবাক্স রয়েছে। তবে জোহরের ওয়াক্তে জামাতে নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে মাত্র সাতজনকে।
পাশেই উত্তরণ হাউজিংয়ের নতুন স্থাপনা তৈরির তোড়জোড়।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয়, মসজিদের সামনেই ঝুলছে ঢাকা জেলা প্রশাসনের নোটিশ। সেখানে লেখা— ‘জেলা প্রশাসক, ঢাকা-এর মালিকানাধীন ভূমি’।
অর্থাৎ, জমিটি সরকারি বলে প্রশাসন চিহ্নিত করেছে। এর পরও স্থাপনাটি বহাল রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্মীয় স্থাপনা থাকলে উচ্ছেদ কঠিন হবে—এ সুযোগ কাজে লাগাতেই সরকারি জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে মসজিদটি কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। নথিতে শুধু নিশ্চিত করা হয়েছে—মসজিদ ও রাস্তা সরকারি খাসজমির ওপর রয়েছে।
ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন
সরকারি বা অন্যের জমি দখল করে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে আলেম মাওলানা ফাহিম হাসান বলেন, ‘যেখানে জবরদখলের মতো অন্যায় জড়িয়ে থাকে, ইসলামী নীতিতে তা নিষিদ্ধ। অন্যের জায়গা বা রাষ্ট্রীয় খাসজমি জোরপূর্বক দখল করে ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণ ইসলাম সমর্থন করে না।’
তিনি মসজিদে নববী নির্মাণের উদাহরণ দিয়ে বলেন, নির্ধারিত জমি দুই এতিম শিশুর হলেও বিনামূল্যে তা নেওয়া হয়নি। মূল্য পরিশোধ করেই সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, সরকারি জমি কোনোভাবেই কেউ দখলে রাখতে পারবে না।
‘আমরা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছি। প্রশাসনিক আরো কিছু কাজ বাকি রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষ হলেই সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।’
প্রশ্ন এখন ১২০ পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে
সরকারি তদন্তে একাধিক দাগে খাসজমি দখলের তথ্য উঠে এসেছে। প্রশাসনের নির্দেশে নামজারি কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে, সরকারি সম্পত্তি চিহ্নিত করে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। সামনে রয়েছে ডিজিটাল সার্ভে ও উচ্ছেদ অভিযান।
অন্যদিকে উত্তরণ হাউজিংকে ঘিরে জমি ও টাকা নিয়ে জটিলতায় পড়া প্রায় ১২০টি পরিবার এখন অনিশ্চয়তায়—তাঁদের জমি ও অর্থের কী হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
একদিকে সরকারি জমি উদ্ধারে প্রশাসনের তৎপরতা, অন্যদিকে প্রকল্পে প্লট ও স্থাপনার কাজ চলার চিত্র—দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে নতুন প্রশ্ন।
সরকারি নথিতে যখন খাসজমি দখলের চিত্র স্পষ্ট, তখন সেই জমির ওপর গড়ে ওঠা প্লট, রাস্তা ও স্থাপনার ভবিষ্যৎ কী—এখন সেটিই দেখার বিষয়।