হাইড্রোলিক হর্ণ: একটি নীরব সংকটের জোরালো আওয়াজ - আরফাতুর রহমান শাওন -

আধুনিক নগরজীবনে শব্দদূষণ একটি অবহেলিত কিন্তু মারাত্মক পরিবেশ সমস্যা। বাংলাদেশের রাস্তায় মোটরবাইকে হাইড্রোলিক হর্ণের ব্যবহার এই সংকটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যে হর্ণটি মূলত বড় ট্রাক বা শিল্প যানবাহনের জন্য তৈরি, তা এখন দুই চাকার যানে অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা চলে আইনের চোখ এড়িয়ে, বিবেকের তোয়াক্কা না করে।
হাইড্রোলিক হর্ণ বায়ু বা তরল চাপ ব্যবহার করে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার শব্দ উৎপন্ন করে। সাধারণ হর্ণের শব্দমাত্রা যেখানে ৮০-৯০ ডেসিবেল, হাইড্রোলিক হর্ণ সেখানে ১১০-১৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৮৫ ডেসিবেলের উপরে দীর্ঘস্থায়ী শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করতে পারে।
একটি শিশুর শ্রবণ ও স্নায়ুতন্ত্র বিকাশমান অবস্থায় থাকে। আচমকা উচ্চশব্দ তাদের মানসিক আঘাত দেয়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হঠাৎ উচ্চশব্দ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, হৃদস্পন্দন অনিয়মিত করে তোলে। বৃদ্ধদের জন্য এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকায় এই হর্ণের ব্যবহার রোগীর সুস্থতার প্রক্রিয়াকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় অনুমোদিত মাত্রার বাইরে শব্দ সৃষ্টিকারী হর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণগুলো বহুমাত্রিক- আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা, জনসচেতনতার অভাব, হর্ণ বিক্রি ও সংযোজনে কোনো নজরদারি নেই, সামাজিক মনোভাবে শব্দদূষণকে "তুচ্ছ" বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাজধানীতে বিশেষ করে পুরান ঢাকায় হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহারকারী মোটরবাইকাররা ট্রাফিক সিগন্যালে বা যানজটে আটকে পড়লে বারবার হর্ণ বাজিয়ে সামনের যানবাহনকে সরে যেতে চাপ দেয়। এটি সবচেয়ে সাধারণ ও বিরক্তিকর প্রবণতা। তারা দ্রুতগতিতে অন্য গাড়িকে পেছনে ফেলতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ হর্ণ বাজিয়ে রাখে যা পথচারী ও অন্য চালকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। শুধু তাই নয়, সরু রাস্তায় বা বাঁকে বিপদ সংকেত দেওয়ার বদলে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার করেছে যা সতর্কতার বদলে রাস্তার পথচারীদের চলা চলে ভয় তৈরি করছে। আরো লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাতে রাস্তা ফাঁকা থাকলেও বাইকাররা গতির উত্তেজনায় অকারণে হর্ণ বাজায়। বিশেষ করে মধ্য রাতে বাইকাররা রাস্তায় উচ্চ শব্দে দ্রুত বেগে চলাচল করার কারণে ঘুমন্ত মানুষ, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা একটি সমাজে কোনভাবে মেনে নেয়া কিংবা কাম্য বিষয় নয়। স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির-গীর্জা অর্থাৎ উপাসনালয় ও হাসপাতাল সংবেদনশীল এলাকায়ও কোনো সংযম দেখা যাচ্ছে না। নিষেধাজ্ঞার সাইনবোর্ড থাকলেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে।
তাছাড়া একদল বাইকার একসঙ্গে চলার সময় পরস্পরকে উৎসাহিত করতে বা আধিপত্য দেখাতে একযোগে হর্ণ বাজাচ্ছে যা কার্যত শব্দ-সন্ত্রাসে পরিণত হচ্ছে। এদের অধিকাংশের বয়স ও সামাজিক অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, বয়সভিত্তিক ১৬-২৮ বছর বয়সী তরুণ। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া এই শ্রেণি মনোবিজ্ঞানের ভাষায় "রিস্ক-টেকিং বিহেভিয়ার"-এর সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। উচ্চশব্দ তাদের কাছে সাহসিকতার প্রতীক বলে মনে করে। সামাজিক অবস্থানভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে,নিম্ন আয়ের শ্রেণি যারা- ডেলিভারি ম্যান, রিকশা-বাইক চালক, দিনমজুর। হাইড্রোলিক হর্ণ সস্তায় পাওয়া যায় বলে শখের বশে ব্যবহার করছে। তাছাড়া তাদের আইন সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত কম।
শিক্ষা ও সচেতনতা সমানুপাতিক নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ দুর্বলতার কারণে ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক কারণে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যাপক বেড়েছে। ক্ষমতা প্রদর্শনের মানসিকতার উদাসীনতা, আইনের ভয়হীনতা অর্থাৎ শাস্তি না পাওয়ায় অভ্যাস পাকাপোক্ত হওয়া, সহজলভ্যতা, অনুকরণ প্রবণতায় উৎসাহিত হয়ে অন্যরা করছে দেখে নতুনরাও করছে এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতার অভাব, অন্যের কষ্টের বিষয়ে উদাসীনতাই বেপরোয়া হয়ে উঠার মূল কারণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে-শিক্ষিত মানুষও আইন অমান্য করছে, কারণ শাস্তির ভয় নেই এবং সামাজিক চাপও নেই। যে সমাজে ভুল করলে কেউ প্রশ্ন করে না, সেখানে বিবেকের কণ্ঠস্বর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
আইন প্রয়োগে কঠোরতা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহারে জরিমানা আদায়ের বিধান কার্যকর করতে হবে, ট্রাফিক পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে হর্ণ জব্দ করার অধিকার দিতে হবে, যেসকল স্থানে হাইড্রোলিক হর্ণ বাজানো হবে সেখানে জনসাধারণের সর্তকতা, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বারবার অপরাধের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে,মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, হাইড্রোলিক হর্ণ আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে, দোকানে বিক্রি বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে, যেসব ম্যাকানিক বাইকে এই হর্ণ লাগায় তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নিতে হবে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হাইড্রোলিক হর্ণ বিক্রি নিষিদ্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে হবে।
তাছাড়া বাইক নিবন্ধনের সময় হর্ণের ধরন যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে, নির্দিষ্ট ডেসিবেল সীমা পরিমাপের জন্য সাউন্ড মিটার ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে, ফিটনেস সনদ নবায়নে হর্ণ পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, স্মার্ট সিটি প্রকল্পে শব্দ পর্যবেক্ষণ সেন্সর স্থাপন করতে হবে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম হিসেবে স্কুল-কলেজে ট্রাফিক সচেতনতা ক্লাস চালু করতে হবে, পাঠ্যবইয়ে শব্দদূষণের ক্ষতি সম্পর্কে অধ্যায় সংযোজন করতে হবে,শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতা র্যালি আয়োজন করতে হবে, টেলিভিশন ও রেডিওতে নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি বেশি ক্যাম্পেইন পরিচালনা ও সংবাদপত্রে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে মসজিদের খুতবায় শব্দদূষণের ক্ষতি তুলে ধরতে হবে, সামাজিক সংগঠনগুলোকে প্রচারণায় সম্পৃক্ত করা যেত।