ফেসবুকে এই ২০ বিষয়ে পোস্ট করার আগে ভাবুন, বিশেষত চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিজীবীরা

শুরুর দিকে ফেসবুক বা সামাজিকমাধ্যমকে কেবল বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম মনে করা হলেও এখন আর সেই সুযোগ নেই। বর্তমানে এসব মাধ্যম ব্যবহারকারীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় বিশ্বাস, ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান, জীবনধারা, পেশাগত পরিচয়, স্বাস্থ্যসচেতনতা, পছন্দ-অপছন্দ, আদর্শ, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা, মানসিকতা এবং পারিবারিক পটভূমি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
আপনি হয়তো হেলায় সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে এমন কিছু পোস্ট করছেন, যা পরবর্তীতে আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব পোস্টের কারণে আপনাকে নানা ধরনের সমস্যায়ও পড়তে হতে পারে। কারণ, সামাজিকমাধ্যমে আপনার আইডি বা হ্যান্ডেলের দিকে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নজর থাকতে পারে। কখনো কখনো বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিকমাধ্যমে আপনার প্রকাশ্য তথ্য ও কার্যক্রম যাচাই করা হয়। এসব বিষয় হয়তো কখনো আপনাকে জানানো হয় না, কিংবা আপনি নিজেও তা জানতে পারেন না।
অথচ এর মধ্যেই আপনার ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যেতে পারে।
আজ আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলো সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশ বা শেয়ার করার আগে সতর্ক হওয়া উচিত। একই সঙ্গে এসব পোস্ট বা কার্যক্রম কীভাবে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেটিও তুলে ধরব।
১. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা
একজন ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা। অনেক সময় না বুঝে বা আবেগের বশে আমরা নিজেরাই এসব তথ্য প্রকাশ করে ফেলি, যা পরবর্তীতে বিপদের কারণ হতে পারে। যেমন, আপনি কোনো একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শুরু করেছেন। এ জন্য আপনার ট্রেড লাইসেন্সটির ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলেন, যেখানে আপনার ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে।
আপনার প্রতিযোগী বা যেকোনো ক্ষতিকারক ব্যক্তি সেটি ডাউনলোড করে রাখতে পারে এবং আপনার ব্যবসার ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে নিজের বা অন্য কারও ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা, ই-মেইল আইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সামাজিকমাধ্যমে বা জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া মারাত্মক ভুল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধও হতে পারে।
২. লোকেশন বা অবস্থান
রিয়েল-টাইম লোকেশন চেক-ইন, বাড়ির সঠিক ঠিকানা বা নিয়মিত যাতায়াতের রুট প্রকাশ করা নিরাপদ নয়। এটি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ধরুন, কেউ একজন আপনার ক্ষতি করতে চায়। আপনি নিয়মিত লোকেশন প্রকাশ করলে সে আপনাকে ট্র্যাক করতে পারবে—আপনি কোন সময়ে সাধারণত কোথায় থাকেন। এতে তার পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে। এভাবে আপনারই শেয়ার করা তথ্য আপনার বিরুদ্ধে নানাভাবে ব্যবহার হতে পারে।
৩. ব্যক্তিগত ছবি
নিজের বা অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মুহূর্ত, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা অপ্রস্তুত অবস্থার ছবি বা ভিডিও তাঁর অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া ফেসবুকে বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা বিপজ্জনক হতে পারে। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তির চরিত্রহনন বা দলীয় ট্যাগিংয়ে এমন ছবি অহরহ ব্যবহার করা হয়। এ জন্য হরহামেশা মানুষের সঙ্গে ছবি প্রকাশ না করাই শ্রেয়।
ধরুন, আপনি আপনার প্রেমিকা বা স্ত্রীর সঙ্গে কোথাও ঘুরতে গেলেন। সেখানে আপনি বেশ ঘনিষ্ঠভাবে ছবি তুলে সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশ করলেন। মনে রাখা দরকার, আপনার আশপাশের সব মানুষ আপনার মতো করে বিষয়টি দেখবেন না। কিন্তু আপনি ছবিটি পোস্ট করেছেন সবার দেখার জন্য। এমন হতে পারে, আপনার অফিসের বস এই ছবি দেখার পর আপনার ব্যক্তিত্ব বা পেশাদারিত্ব সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে পারেন। এতে অফিসের পরবর্তী নানা সিদ্ধান্তে আপনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৪. অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক
প্রেম, দাম্পত্য কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। সম্পর্কের ভালো মুহূর্ত প্রকাশ করা যেমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, তেমনি সম্পর্ক খারাপ হলে সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য, অভিযোগ, কথোপকথন বা অন্তরঙ্গ বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরা আরও সংবেদনশীল ব্যাপার। এতে শুধু অন্য ব্যক্তির গোপনীয়তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, আপনার নিজের বিচক্ষণতা সম্পর্কেও মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
যেমন, আপনার একটি সম্পর্ক ভেঙে গেছে। ক্ষুব্ধ হয়ে সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথন, ছবি এবং সম্পর্কের বিভিন্ন ঘটনা ফেসবুকে প্রকাশ করলেন। কয়েক বছর পর আপনি একটি দায়িত্বশীল চাকরির জন্য আবেদন করলেন। পুরোনো পোস্টগুলো সামনে এলে নিয়োগকর্তা ভাবতে পারেন-ব্যক্তিগত বিরোধে আপনি যদি গোপন তথ্য প্রকাশ করেন, পেশাগত বিরোধেও কি একই আচরণ করবেন?
৫. চ্যাট বা ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট শেয়ার
কেউ আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বার্তা পাঠিয়েছেন মানেই তিনি সেটি জনসমক্ষে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন-এমন নয়। ব্যক্তিগত চ্যাট, ই-মেইল বা ইনবক্সের স্ক্রিনশট অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করলে বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। কথোপকথনের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করে আরও গুরুতর সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
ধরুন, অফিসের একজন সহকর্মী ব্যক্তিগত চ্যাটে তাঁর একটি ভুলের কথা স্বীকার করে আপনার কাছে পরামর্শ চাইলেন। আপনি মজা করে সেই কথোপকথনের স্ক্রিনশট ফেসবুকে দিয়ে দিলেন। তিনি বিব্রত হওয়ার পাশাপাশি অন্য সহকর্মীরাও এরপর আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল কোনো কথা বলতে ভয় পেতে পারেন। অর্থাৎ একটি পোস্ট আপনার বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করে দিতে পারে।
৬. আবেগ বা রাগের বহিঃপ্রকাশ
রাগের সময় মানুষ অনেক কথা বলে বা লেখে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো কখনোই বলত না। সামাজিকমাধ্যমের সমস্যা হলো, রাগ কমে গেলে পোস্ট মুছে ফেলা গেলেও ততক্ষণে কেউ সেটির স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ঘটনার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণাত্মক বা মানহানিকর বক্তব্য প্রকাশ করা পেশাগত ও ব্যক্তিগত-দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর হতে পারে।
যেমন, কোনো সহকর্মীর সঙ্গে আপনার ঝগড়া হলো। প্রচণ্ড রাগের মাথায় তাঁকে উদ্দেশ করে কিছু অপমানজনক কথা লিখলেন। দুই ঘণ্টা পর রাগ কমলে পোস্টটি মুছে দিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই সেটির স্ক্রিনশট আপনার অফিসের একটি গ্রুপে পৌঁছে গেছে। একটি ক্ষণিকের রাগ তখন আপনার দীর্ঘদিনের পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৭. হতাশা
আপনি কোনো বিষয় নিয়ে চরম হতাশ হয়েছেন। সেই হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশ করলেন। এর মাধ্যমে আপনি হয়তো সাময়িকভাবে নিজের মনের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সফল বা বিচক্ষণ মানুষ সাধারণত ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেন। আপনি যখন সামাজিকমাধ্যমে নিজেকে বারবার হতাশাগ্রস্ত বা অতিমাত্রায় নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করবেন, তখন আপনাকে নিয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষণকারী ব্যক্তি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আপনার ওপর গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারেন। অন্যদিকে আপনার হতাশা দেখে যারা আপনার ক্ষতি কামনা করে, তারা আনন্দিত হতে পারে।
৮. অমর্যাদাকর ভাষা
অনেক সময় স্ট্যাটাস বা কমেন্টে অনেকে নানা ধরনের বিদ্রূপাত্মক, আক্রমণাত্মক বা কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেন। মনে রাখা দরকার, আপনার স্ট্যাটাস বা কমেন্ট আসলে গোপনীয় বিষয় নয়; এটি প্রকাশ্যে অনেকেই দেখতে পারেন। তাঁদের মধ্যে আপনার শিক্ষক, প্রতিবেশী, সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তারা আপনার ভাষার ব্যবহার দেখে আপনাকে আক্রমণাত্মক বা অসৌজন্যমূলক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
ফলে আপনাকে কোনো দায়িত্ব দিলে আপনি টিমের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে পারেন-এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে আপনার অমর্যাদাকর আচরণ দেখার ফলে কোনো কাজ বা চাকরির জন্য রেফারেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার পরিচিতজনেরাও বিরত থাকতে পারেন।
৯. সংবেদনশীল বা উসকানিমূলক মন্তব্য
ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত পরিচয়, লিঙ্গ, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ, অবমাননাকর বা উসকানিমূলক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এ ধরনের মন্তব্য সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার পাশাপাশি আপনার পেশাগত গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন করতে পারে। কিছু বক্তব্য আইনগত সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
আপনার ফেসবুককে নিরাপদ রাখবেন যেভাবে
যেমন, আপনি কোনো একটি সম্প্রদায়কে নিয়ে বিদ্রূপ করে একটি মন্তব্য করলেন। কয়েক বছর পর এমন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করলেন, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, অঞ্চল ও পটভূমির মানুষ কাজ করেন। আপনার পুরোনো মন্তব্যটি সামনে এলে প্রতিষ্ঠানটি আশঙ্কা করতে পারে যে, আপনাকে নিয়োগ দিলে কর্মপরিবেশ বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের জন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।
১০. যাচাইহীন রাজনৈতিক বা সামাজিক মেরুকরণমূলক মতামত
রাজনীতি বা বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মতামত থাকতেই পারে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের পক্ষে-বিপক্ষে অন্ধভাবে, যাচাই না করে কিংবা উসকানিমূলক ভাষায় নিয়মিত পোস্ট করা আপনার পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এমন কোনো বক্তব্য, যা ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করে বা বিদ্বেষ ছড়ায়, সেটি দেখে একজন নিয়োগকর্তা আপনার নিরপেক্ষতা, সহনশীলতা ও ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
আপনি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন। আপনার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দেখে প্রতিষ্ঠানটি আপনাকে প্রাথমিকভাবে পছন্দও করেছে। কিন্তু নিয়োগের আগে আপনার সামাজিকমাধ্যমের প্রকাশ্য কার্যক্রম দেখতে গিয়ে তারা দেখল, আপনি নিয়মিত ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে অপমান করে পোস্ট করেন। তখন নিয়োগকর্তার মনে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে-আপনি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলে ভিন্নমতের সহকর্মী বা গ্রাহকের সঙ্গে পেশাদার আচরণ করতে পারবেন কি না। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আপনি পিছিয়ে পড়তে পারেন। অথবা আপনি বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু আপনার এমন কার্যক্রম ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিব্রতকর হতে পারে। এর ফলে আপনার চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বা আপনাকে বড় কোনো দায়িত্ব দেওয়া থেকে কর্তৃপক্ষ বিরত থাকতে পারে।
১১. অতিরিক্ত রাজনৈতিক বা বিতর্কিত মতাদর্শের প্রচার
একজন নাগরিকের রাজনৈতিক মতামত থাকা স্বাভাবিক এবং আইনসঙ্গত মতপ্রকাশের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামাজিকমাধ্যমে এমনভাবে চরম বা আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক অবস্থান প্রচার করা, যেখানে ভিন্নমতের মানুষকে শত্রু, অযোগ্য বা ঘৃণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেটি পেশাগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ধরুন, আপনার প্রতিষ্ঠানের একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্লায়েন্ট আপনার রাজনৈতিক মতের বিপরীত মত পোষণ করেন। আপনি নিয়মিত সেই মতের সব মানুষকে অপমান করে পোস্ট করেন। ক্লায়েন্ট আপনার প্রোফাইল দেখে মনে করলেন, তার সঙ্গে আপনি নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণ করতে পারবেন না। আপনার ব্যক্তিগত পোস্ট তখন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
১২. ভুয়া অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার শো-অফ
সামাজিকমাধ্যমে নিজের অর্জন, অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা তুলে ধরা দোষের নয়। বরং পেশাগত জীবনে এটি অনেক ক্ষেত্রে উপকারী। কিন্তু যে দক্ষতা আপনার নেই, সেটি নিজের আছে বলে দাবি করা, ছোট কোনো অভিজ্ঞতাকে অনেক বড় করে উপস্থাপন করা কিংবা অন্যের কাজকে নিজের বলে প্রচার করা বিপজ্জনক। কারণ বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের আগে প্রার্থীর সিভি, লিংকডইন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত অনলাইন তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারে।
ধরুন, আপনি সামাজিকমাধ্যমে দাবি করলেন যে, একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বড় একটি প্রকল্পে আপনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। আপনার পরবর্তী চাকরির ইন্টারভিউতে নিয়োগকর্তা সেই প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। কয়েকটি প্রশ্নের পরই বোঝা গেল, প্রকল্পটিতে আপনার ভূমিকা ছিল খুবই সীমিত। তখন শুধু ওই দাবিটিই নয়, আপনার সিভিতে দেওয়া অন্য তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
১৩. চাকরি না পাওয়ায় ক্ষোভ
আপনি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করেছিলেন, কিন্তু আপনাকে ডাকা হয়নি। অথবা আপনি ইন্টারভিউ দিয়েছেন, কিন্তু আপনার চাকরি হয়নি। ফলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সামাজিকমাধ্যমে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। আপনার এই ক্ষোভ প্রকাশ আপনাকে চাকরিটি পাইয়ে দেবে না; বরং আপনার পরবর্তী চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যেমন, আপনার ক্ষোভের পোস্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বা এইচআর বিভাগের কর্মীদের সামনে পড়তে পারে। অনেক সময় এইচআর পেশাজীবীদের বিভিন্ন গ্রুপেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর ফলে তারা পরবর্তীতে আপনাকে তাদের প্রতিষ্ঠানের ভাইভায় ডাকার ক্ষেত্রেও অনাগ্রহী হতে পারেন।
১৪. অফিস বা কর্মক্ষেত্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়
কর্মক্ষেত্রে সমস্যা, মতবিরোধ বা অসন্তোষ থাকতেই পারে। কিন্তু সহকর্মী, বস, অফিসের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিষ্ঠানের কোনো গোপন বিষয় সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশ করা পেশাদার আচরণ নয়। কিছু তথ্য প্রকাশ করলে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, চাকরির চুক্তি বা প্রযোজ্য আইনও লঙ্ঘিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে হলে সামাজিকমাধ্যমে যা যা করা যাবে না
যেমন, অফিসের একটি মিটিংয়ে নতুন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতবিরোধ হলো। ক্ষুব্ধ হয়ে আপনি ফেসবুকে পুরো ঘটনার বর্ণনা লিখে পোস্ট দিলেন। পোস্টটি অফিসের অন্যদের নজরে পড়ল। কর্তৃপক্ষ তখন ভাবতে পারে, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল কোনো দায়িত্ব দিলে আপনি সেটিও প্রকাশ করে দিতে পারেন। এতে আপনার ওপর প্রতিষ্ঠানের আস্থা কমে যেতে পারে।
১৫. বর্তমান প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা লঙ্ঘন
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যবসায়িক কৌশল, নতুন পণ্য, গ্রাহকের তথ্য কিংবা ব্যবস্থাপনার অপ্রকাশিত সিদ্ধান্ত কর্মীদের কাছে থাকলেও সেগুলো প্রকাশের অধিকার সব সময় তাঁদের থাকে না। চাকরির চুক্তি, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা বা গোপনীয়তা চুক্তি অনুযায়ী এসব তথ্য সুরক্ষিত রাখার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
ধরুন, আপনার কোম্পানি আগামী মাসে নতুন একটি পণ্য বাজারে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। আপনি উত্তেজিত হয়ে ফেসবুকে ইঙ্গিত দিলেন, এমনকি পণ্যটির ছবিও প্রকাশ করলেন। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান আগেভাগে তথ্যটি জেনে নিজেদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করল। আপনার একটি পোস্ট তখন কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং আপনার চাকরিও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
১৬. অফিস, বস বা সহকর্মীদের নিয়ে পরোক্ষ ক্ষোভ
নাম উল্লেখ না করলেও অনেক সময় পোস্টের ভাষা, সময় এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট দেখে বোঝা যায়, আপনি কাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন। ‘আমার অফিসের কিছু মানুষ’, ‘কিছু তথাকথিত বস’ কিংবা ‘যোগ্যতাহীন সহকর্মী’—এ ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্টও কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে।
ধরুন, বসের সঙ্গে সকালে আপনার কথা-কাটাকাটি হয়েছে। দুপুরে আপনি লিখলেন, ‘পদ বড় হলেই মানুষ বড় হয় না; কিছু অযোগ্য মানুষ ক্ষমতা পেলে অফিস নরক হয়ে যায়।’ আপনি কারও নাম লেখেননি। কিন্তু সহকর্মীরা ঘটনার কথা জানেন। ফলে পোস্টটি কাকে উদ্দেশ করে লেখা, তা বুঝতে তাঁদের অসুবিধা হলো না। এতে পরিস্থিতি সমাধানের বদলে আরও জটিল হতে পারে।
১৭. পূর্ববর্তী বা বর্তমান কর্মক্ষেত্র নিয়ে বিদ্বেষ প্রকাশ
কোনো প্রতিষ্ঠান ছেড়ে আসার পর সেই প্রতিষ্ঠানের সবকিছু ভালো বলতে হবে—এমন নয়। যৌক্তিক অভিযোগ থাকলে যথাযথ জায়গায় তা তোলা যেতে পারে। তবে সাবেক প্রতিষ্ঠান, বস বা সহকর্মীদের ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে প্রতিশোধমূলক পোস্ট করা ভবিষ্যৎ নিয়োগকর্তার কাছেও নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
যেমন, চাকরি ছাড়ার বা হারানোর পর আপনি সাবেক কর্মস্থল বা বসকে নিয়ে একের পর এক নেতিবাচক পোস্ট করলেন এবং অফিসের নানা অভ্যন্তরীণ ঘটনা প্রকাশ করলেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের একজন এইচআর কর্মকর্তা সেগুলো দেখলে ভাবতে পারেন, ভবিষ্যতে তাদের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেলেও আপনি একইভাবে তাঁদের অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ করবেন। ফলে আপনাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সতর্ক হতে পারেন।
১৮. কর্মঘণ্টা বা কাজ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য
কাজের চাপ বা অফিস নিয়ে মাঝেমধ্যে বিরক্ত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কর্মঘণ্টায় বসে বারবার ‘বোরিং জব’, ‘টক্সিক অফিস’, ‘কাজ করতে ভালো লাগে না’ কিংবা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করে পোস্ট দেওয়া আপনার কাজের প্রতি মনোভাব সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
ধরুন, অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ শেষ করার সময়সীমা আজই। অথচ দুপুরে আপনি ফেসবুকে লিখলেন, ‘এই বোরিং অফিসে সময়ই কাটে না।’ পোস্টটি আপনার টিম লিডারের চোখে পড়ল। তিনি হয়তো ভাবতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়েও আপনি দায়িত্বের চেয়ে সামাজিকমাধ্যমে নিজের অসন্তোষ প্রকাশে বেশি মনোযোগী।
১৯. প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বিরুদ্ধে কনটেন্ট প্রকাশ
আপনি কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে ব্যক্তিগত সামাজিকমাধ্যমের সব বক্তব্য প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য হয়ে যায় না। তারপরও এমন কিছু কনটেন্ট, মিম, ট্রল বা প্রচারণায় অংশ নেওয়া উচিত নয়, যা সরাসরি আপনার প্রতিষ্ঠানের পণ্য, গ্রাহক, সহকর্মী বা ব্র্যান্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে আপনার প্রোফাইলে কর্মস্থলের পরিচয় প্রকাশিত থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ধরুন, আপনি একটি মোবাইল ফোন কোম্পানিতে কাজ করেন। মজা করে নিজের কোম্পানির একটি পণ্যকে ‘বাজারের সবচেয়ে বাজে ফোন’ উল্লেখ করে একটি ট্রল শেয়ার করলেন। আপনার কাছে এটি নিছক রসিকতা হলেও গ্রাহকের কাছে প্রশ্ন উঠতে পারে-কোম্পানির নিজের কর্মীই যদি পণ্যের ওপর আস্থা না রাখেন, তাহলে তারা কেন সেটি কিনবেন?
২০. স্বার্থের সংঘাত
বর্তমান কর্মক্ষেত্রের সরাসরি প্রতিযোগী কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বা পণ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা আর্থিক সম্পর্ক থাকলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নিজের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রচার চালালে কর্তৃপক্ষ আপনার আনুগত্য ও পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
ধরুন, আপনি একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে কাজ করেন। অথচ সামাজিকমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের পণ্য প্রচার করছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে তুলনামূলকভাবে খারাপ দেখাচ্ছেন। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তারা জানতে চাইতে পারেন—প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনার কোনো আর্থিক বা অন্য স্বার্থের সম্পর্ক আছে কি না।
শেষ কথা
সামাজিকমাধ্যমে আপনি কী লিখছেন, কোন ছবি দিচ্ছেন, কী শেয়ার করছেন কিংবা কী মন্তব্য করছেন-এসবকে এখন আর শুধু ‘ব্যক্তিগত ফেসবুকের বিষয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ সব ক্ষেত্রে নেই। বিশেষ করে চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিজীবীদের মনে রাখা দরকার, সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আপনার পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে চাকরি রক্ষার জন্য সামাজিকমাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ বন্ধ করে দিতে হবে। ব্যক্তিগত মত, রাজনৈতিক মত, সমালোচনা কিংবা প্রতিবাদ প্রকাশ করা একজন মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। মূল বিষয় হলো-আপনি যা প্রকাশ করছেন সেটি সত্য কি না, ভাষা দায়িত্বশীল কি না, অন্যের অধিকার ও গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করছে কি না, কর্মক্ষেত্রের বৈধ গোপনীয়তা ভঙ্গ করছে কি না এবং কয়েক বছর পর পোস্টটি সামনে এলেও আপনি সেটির দায়িত্ব নিতে পারবেন কি না।
তাই কোনো সংবেদনশীল পোস্ট দেওয়ার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন—তথ্যটি কি সত্য ও যাচাই করা? এটি প্রকাশের অধিকার কি আমার আছে? এতে অন্য কারও গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি? আমার শিক্ষক, সহকর্মী, বস, ভবিষ্যৎ নিয়োগকর্তা বা পরিবারের সদস্য এটি দেখলেও কি আমি একইভাবে কথাটির পক্ষে দাঁড়াতে পারব?
উত্তর নিয়ে যদি দ্বিধা থাকে, পোস্ট করার আগে আরেকবার ভাবুন। কারণ সামাজিকমাধ্যমে একটি পোস্ট লিখতে হয়তো দুই মিনিট লাগে, কিন্তু তার স্ক্রিনশট বা ডিজিটাল রেকর্ডের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।